শক্তিশালী গণসংযোগ মাধ্যম হিসাবে রেডিও এবং টেলিভিশনের দায়িত্ব অপরিসীম। তথ্য পরিবেশন, শিক্ষা প্রসার, উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে সকলকে উদ্বুদ্ধকরণ ও নির্মল আনন্দদান। এই চারটি ব্যাপারই হবে অনুষ্ঠান প্রচারের মূল লক্ষ্য। এই চারটি মূল লক্ষ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচারের ক্ষেত্রে রেডিও বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ টেলিভিশন নিম্নবর্ণিত নীতিমালা অনুসরণ করবেঃ
১। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে অনুষ্ঠান রচনা করতে হবে।
২। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতি সম্পর্কে জনসাধারণকে শিক্ষিত/অবহিত করে তাদেরকে রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও সর্বোপরি দেশপ্রেমের চেতনাসম্পন্ন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসাবে গড়ে তোলার বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
৩। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রকাশ ও বিকাশ সাধন করতে হবে।
৪। দেশী সংস্কৃতির অগ্রগতির জন্য বাংলাদেশের আবহমান নিজস্ব মুসলিম সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ভাবধারার প্রতিফলন, বাংলাদেশী সংস্কৃতির সঙ্গে জনসাধারণের নিবিড় যোগসূত্র স্থাপন এবং বিভিন্ন অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ধারাকে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের আদর্শে অনুপ্রাণিত করে বাংলাদেশ সংস্কৃতির সুষ্ঠু প্রতিফলন ও পরিবর্ধনের চেষ্টা করতে হবে।
৫। সকল ধমর্ীয় অনুভূতির প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হবে। কোন জাতি, ধর্ম, সম্প্রদায় বা ব্যক্তি বিশেষের প্রতি কোনরূপ অবমাননা, স্লেষ, কটাক্ষ বা সমালোচনা করা যাবে না এবং সাম্প্রদায়িকতা পরিহার করতে হবে।
৬। উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, বিশেষ করে স্বেচ্ছাভিত্তিক অংশগ্রহণ জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধকরণ এবং এই লক্ষ্যের বাস্তবায়নে আলোচনা অনুষ্ঠান ও উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ওপর যথাসম্ভব সচিত্র প্রতিবেদন উপস্থাপিত করতে হবে। শ্রমের মর্যাদা ও কায়িক পরিশ্রমের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। ব্যক্তিগত ও সামাজিক কল্যাণ এবং অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য নিজ হাতে কাজ করা যে অবমাননাকর নয় এবং এজন্য কোন পেশা বা বৃত্তি যে হেয় নয়, অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তা ফুটিয়ে তুলতে হবে।
৭। সংস্কৃতি ও চিত্তবিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের সঠিক মূল্যায়ন করে শ্রোতা দর্শকদের নির্মল আনন্দ পরিবেশনের প্রচেষ্টা চালাতে হবে। বাংলাদেশী সংস্কৃতির সমৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিল্প ও শিল্পীদের অনুসন্ধান ও আবিস্কার করে তাদেরকে অনুপ্রাণিত করতে হবে এবং জনসমক্ষে তুলে ধরতে হবে।
৮। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষার যোগ্য মর্যাদায় সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের এবং এই উদ্দেশ্যে সঠিক বাংলা উচ্চারণের একটি আদর্শ মান স্থাপনের চেষ্টা করতে হবে। সংবাদ পাঠ ও অনুষ্ঠান ঘোষণার ক্ষেত্রে কোনক্রমেই উচ্চারণের মান শিথিল করা যাবে না।
৯। রেডিও বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠান মূলতঃ বাংলায় প্রচার করা হবে। সামগ্রিক অনুষ্ঠান নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে সংবাদ, বিদেশী ছায়াছবি ও সংগীত প্রচারিত হবে এবং বিনিময় অনুষ্ঠান প্রচারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনবোধে এই নীতি শিথিল করা যাবে ।
১০। নাটক, লোক সংস্কৃতিমূলক ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করা যাবে, তবে কোন ক্রমেই কোন অঞ্চলের প্রতি কটাক্ষ করার জন্য আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না।
১১। কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দেশকে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার আন্দোলনে জনসাধরণকে অনুপ্রাণিত করতে হবে। বিশেষ করে কৃষক, শ্রমিক ও অন্যান্য কমর্ীদেরকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাধরণ মানুষের সমস্যা ও তাদের আশা আকাঙ্খার প্রতিফলনের ব্যবস্থা করতে হবে।
১২। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ভয়াবহতা সম্পর্কে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জনগণকে সদা সচেতন রাখতে ও এ সম্পর্কে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে তাদেরকে আগ্রহী করে তুলতে হবে। শালীনতা, রুচি ও দেশীয় কৃষ্টির প্রতি যথেষ্ট দৃষ্টি রেখে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম প্রচার করা হবে।
১৩। দেশের প্রতিটি নিরক্ষর মানুষকে সাক্ষর হতে সচেতন ও আগ্রহী করার জন্যে অনুষ্ঠান রচনা ও প্রচার করা হবে।
১৪। জনসাধারণকে দেশের শিল্পের উন্নয়ন ও দেশের প্রযুক্তি উদ্ভাবনে উদ্বুদ্ধ করে তুলতে হবে।
১৫। যুব সম্প্রদায়ের সৃজনশীল চিন্তাধারা ও শক্তিকে কর্মক্ষেত্রে নিয়োগের পথ নির্দেশ দিতে হবে এবং তাদের সমস্যা সমাধানের ফলপ্রসূ ইঙ্গিত প্রদান করতে হবে।
১৬। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধমর্ীয় তথা সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি মহিলাদের সমমর্যাদা ও সক্রিয় অংশগ্রহণের লক্ষ্যে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মহিলা সমাজকে উদ্বুদ্ধ করার বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যেন মহিলা সমাজ আমাদের জাতিকে প্রত্যয়দীপ্ত রাখার ব্যাপারে সত্যিকারের অর্থপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
১৭। শিশুদের সৌজন্য শিক্ষা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, ধর্ম, সমাজ ও জাতীয় জীবনের এবং বিশেষ করে ইসলামের মহাপুরুষদের আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট করে তুলতে হবে। ছোটদের অনুষ্ঠানে ভাই-বোন, পিতা-মাতা, বয়োজ্যেষ্ঠ ও প্রতিবেশীদের সাথে শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও সহযোগিতামুলক সম্পর্কের প্রতিফলনকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। ছোটদের অনুষ্ঠানে পরনিন্দা, বিবাদ, কলহের দৃশ্য পরিহার করতে হবে। দেশপ্রেম ও চরিত্র গঠনের সুশিক্ষা প্রদানের দিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হবে।
১৮। নৈতিকতাবোধের উন্নয়ন, সামজিক কুসংস্কার থেকে মুক্তি এবং সমাজ বিরোধী কার্যকলাপ অবদমনের দায়িত্ব পালন করার লক্ষ্যে সকল প্রকার দুনর্ীতি দমন ও সমাধানের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত করতে হবে।
১৯। অনুষ্ঠানে কোন প্রকার অশোভন উক্তি উচ্চারণ করা যাবে না।
২০। অনুষ্ঠানে সরাসরি বা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কোন রাজনৈতিক দলের বক্তব্য বা মতামত প্রচার করা যাবে না।
২১। অনুষ্ঠানে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে সততা, আনুগত্য, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, মিতব্যয়িতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ ফুটিয়ে তুলতে হবে।
২২। জাতীয় সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট সকল কর্মচারী এবং জনসাধারণকে দায়িত্বশীল হওয়ার জন্য সচেতন করে তুলতে হবে।
২৩। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মনোভাব জাগরূক করে তুলতে হবে।
২৪। কোন মানুষ বা প্রাণী নির্যাতনের দৃশ্য অনুষ্ঠানে প্রচার করা যাবে না। নাটকের প্রয়োজনে বিশেষ ক্ষেত্রে এই নীতি শিথিল করা যেতে পারে।
২৫। অনুষ্ঠানে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রকৃত ও সর্বজনস্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা গৌরবান্বিত করতে হবে।
২৬। দেশী ও বিদেশী ছবি/অনুষ্ঠানে অশ্লীল চুম্বনের দৃশ্য সর্বতোভাবে পরিহার করতে হবে। হিংসাত্মক, সন্ত্রাসমূলক এবং আমাদের সাংস্কৃতিক মুল্যবোধের পরিপন্থী কোন অনুষ্ঠান প্রচার করা যাবে না।
২৭। বিজ্ঞাপনে প্রদত্ত পণ্যের উৎকর্ষ প্রচার করতে গিয়ে অন্য কোন পণ্যকে হেয় করা যাবে না। বিজ্ঞাপনে কোন অশ্লীল বা অশোভন দৃশ্য বা উক্তি থাকতে পারবে না।
[এনবিএ (চেয়ারম্যান)/০৩/৮৫, তারিখ: ০১-০১-১৯৮৬]